“অবৈধ জাল বন্ধ কর, মৎস্যসম্পদ রক্ষা কর”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে জাতীয় সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী।
বুধবার সকাল ১০টায় শেকৃবির সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। এসময় তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
প্রবন্ধে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় ও উপকূলীয় জলাশয় জাতীয় মৎস্যসম্পদের প্রধান উৎস। দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি মৎস্যখাত দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে এবং জাতীয় জিডিপিতে ১.৫৩ শতাংশ ও কৃষিজ জিডিপিতে ২২.২৬ শতাংশ অবদান রাখে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, বেহুন্দি, খুঁটা ও মশারি জালসহ বিভিন্ন অবৈধ ও বিধ্বংসী জালের নির্বিচার ব্যবহারে পোনা ও মা মাছ ধ্বংস হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র, হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য।
উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৭ লাখ জেলে সরাসরি এবং ২৫ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ইলিশের ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ৭.৩৩ শতাংশ কমেছে, যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছিল। এ পতনের অন্যতম কারণ উপকূলজুড়ে অবৈধ জালের অবাধ ব্যবহার।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ জালের বেষ্টনীতে ডিম ছাড়তে আসা মা ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারে না। ডিম দেওয়ার পরও ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ও জলজ জীব ধ্বংস হয়। সরকার ২২ দিনের অবরোধসহ নানা কর্মসূচি নিলেও বাস্তবে অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। ফলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নাগরিক উদ্যোগভিত্তিক আন্দোলন জরুরি।
এসময় তিনি সরকার, গণমাধ্যম, গবেষক, শিক্ষার্থী, জেলে সম্প্রদায়, পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণে একটি “জাতীয় সামাজিক আন্দোলন” গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
১০ দফা কর্মসূচি
ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—
১) জনসচেতনতা বৃদ্ধি অভিযান,
২) গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা,
৩) জেলেদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি,
৪) কঠোর আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার,
৫) জাল প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ,
৬) গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন,
৭) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম,
৮) উপজেলা পর্যায়ে নদী ও মৎস্য রক্ষা কমিটি গঠন,
৯) সরকার ও সিভিল সোসাইটির যৌথ উদ্যোগ এবং
১০) ‘অবৈধ জাল বিরোধী সপ্তাহ’, হটলাইন ও বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল ভদ্র, পার্লামেন্ট নিউজ বিডির সম্পাদক শাকিলা পারভিন, রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ এবং পরিবেশকর্মী ও আবাসন নিউজের সম্পাদক ইবনুল সাঈদ রানা। তারা বলেন, সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিলে অবৈধ জাল ব্যবহার ও জলজ সম্পদ ধ্বংসের প্রবণতা কমানো সম্ভব।
প্রশ্নোত্তর পর্বে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, মোহনা ও উপকূলে অবৈধ জাল কমলে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারবে, জাটকা রক্ষা পাবে এবং উৎপাদন বাড়লে বাজারে ইলিশের দামও কিছুটা কমবে। তিনি জানান, এ আন্দোলন দীর্ঘদিনের উপলব্ধি থেকে শুরু হয়েছে এবং সবার অংশগ্রহণেই একে জাতীয় সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।