ভয়াল রূপে তিস্তা, সুন্দরগঞ্জে ভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি-ফসলি জমি

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি :
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষার শুরুতেই ফের ভয়াল রূপ ধারণ করেছে তিস্তা নদী। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও তীব্র স্রোতের তোড়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের শখের বাজার ও কালির খামার এলাকায় শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। গত পাঁচ-ছয় দিনে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, ফলজ গাছপালা ও বাঁশঝাড় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শতাধিক পরিবার।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতু সড়ক থেকে মাত্র ১০০ মিটার পূর্বে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও বহু ঘরবাড়ি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আতঙ্কে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে ব্যস্ত মানুষজন। কেউ ঘরের টিন খুলে নিচ্ছেন, কেউ বাঁশের বেড়া ও আসবাবপত্র সরাচ্ছেন। গরু-ছাগল নিয়ে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। শিশুদের কান্না, নারীদের আহাজারি আর বৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

ভাঙনে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ফজলু মিয়া, আলম মিয়া, হাফিজার রহমান, আশেক আলী, বাবলু মিয়া, মঞ্জু মিয়া, খলিল মিয়া, আকবার আলী ও বিধবা রহিমা বেগমসহ বহু পরিবার। তাদের বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা নদীতে বিলীন হয়েছে।

রহিমা বেগম (৬৫) বলেন, “আগেও একবার নদীভাঙনে সব হারাইছি। পরে কষ্ট করে আবার ঘর তুলছিলাম। এখন সেই ঘরও নদীতে যাইতেছে। আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।”

একইভাবে আবুল কালাম বলেন, “এটা আমার চতুর্থবারের মতো সব হারানো। ধারদেনা করে ঘর তুলছিলাম। এখন আবার ভাঙন ঘরের কাছে চলে আসছে। পরিবার নিয়ে কোথায় যামু বুঝতেছি না।”

কৃষক আলম মিয়া জানান, তার ভুট্টাখেত ও শাকসবজির জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “এই ফসল বিক্রি করেই সংসার চলতো। এখন সামনে কী হবে জানি না।”

ভিটেমাটি হারানো অনেক পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ রাস্তার পাশে কিংবা বাঁধের ওপর পলিথিন টানিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দেখা দিয়েছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সংকট।

এদিকে ভাঙন পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে প্রাণসংকটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। হঠাৎ নদীতীরের মাটি ধসে তিনি স্রোতে তলিয়ে গেলে স্থানীয়রা ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এতে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই নদীভাঙনে সর্বস্ব হারাতে হয় তাদের। কিন্তু স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তারা দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা, ডাম্পিং কার্যক্রম শুরু এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন, “ভাঙনকবলিত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “ভাঙনপীড়িত মানুষের জন্য দ্রুত ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে। পুনর্বাসনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এদিকে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, “দ্রুত জিও ব্যাগ না ফেলা হলে আরও শত শত ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাবে। তিস্তাপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে।”

প্রতিবছরের মতো এবারও তিস্তার ভাঙনে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন নদীপাড়ের মানুষ। ঘর হারিয়েও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন তারা। তবে স্থায়ী সমাধান ছাড়া তাদের দীর্ঘশ্বাস থামবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত