পাথরঘাটায় সংরক্ষণের অভাবে নীরবে ভেঙে পড়ছেন আলুচাষীরা

মিনহাজুর রহমান, পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিনিধি :
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পাথরঘাটার কালমেঘা ইউনিয়নের একটি উঠানে স্তূপ করে রাখা আলুর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন কৃষক ফজলুল করিম। কয়েক মাসের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের ফসল এখন তাঁর চোখের সামনে পড়ে আছে—নষ্ট হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। আলুগুলো দেখলে বোঝার উপায় নেই, এগুলোই একসময় ছিল তাঁর স্বপ্ন, সন্তানের পড়াশোনা আর সংসারের নিরাপত্তার ভরসা।

 

চলতি মৌসুমে বরগুনা ও পাথরঘাটায় আলুর ফলন হয়েছে ভালো। মাঠে মাঠে উঠেছে বাম্পার উৎপাদন। মৌসুমের শুরুতে তাই অনেক কৃষকই আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু সেই আশা বেশিদিন টেকেনি। কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় আলু সংরক্ষণের কোনো উপায় নেই। ফলে মাঠ থেকে তোলার পরপরই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।

ফজলুল করিম জানান, তিন একর জমিতে আলু আবাদ করতে তাঁকে ধার করতে হয়েছে টাকা। “ভাবছিলাম আলু তুলে কিছুদিন রেখে ভালো দামে বিক্রি করবো। কিন্তু রাখবো কোথায়? উঠানে আর কতদিন রাখা যায়?”—বলতে বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।

 

পাশের নাচনাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা মেলে কৃষক গোলাম মোস্তফা কামালের সঙ্গে। আলুর বস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “সার, বীজ, সেচ—সব কিছুর দাম বেড়েছে। দিন শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখি, লাভ তো দূরের কথা, উল্টো দেনায় পড়ে যাচ্ছি।” তাঁর চোখে ভাসে অনিশ্চিত আগামী দিনের ছবি। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আলু চাষ ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি।

 

একই চিত্র বরগুনা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমান মজনু বলেন, “প্রতি বছরই মৌসুমে আলুর দাম পড়ে যায়। পরে যখন দাম বাড়ে, তখন কৃষকের হাতে আর আলু থাকে না। তখন লাভ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা।” দূরের জেলায় কোল্ডস্টোরেজে আলু রাখতে গেলে পরিবহন ও ভাড়ার খরচ এত বেশি যে সাধারণ কৃষকের পক্ষে তা বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর কথা যতই বলা হোক না কেন, সংরক্ষণের বাস্তব সুবিধা না থাকায় তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য মিলছে না। আলু উৎপাদনের উপযোগী জমি, অভিজ্ঞ কৃষক ও আগ্রহ—সবই আছে বরগুনা-পাথরঘাটায়। নেই শুধু সংরক্ষণের নিরাপদ আশ্রয়।

এরই মধ্যে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আলুর বদলে অন্য ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এতে শুধু কৃষকের ক্ষতিই নয়, ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের আলু উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

পাথরঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিপন চন্দ্র ঘোষ বলেন, “কোল্ডস্টোরেজ না থাকায় এখানকার আলু চাষিরা বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। চেষ্টা চলছে যাতে এই অঞ্চলে অন্তত একটি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করা যায়।” পাশাপাশি তিনি রোগবালাইমুক্ত আলু চাষ বিস্তারে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়ার কথাও জানান।

উঠানে পড়ে থাকা আলুর স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষক ফজলুল করিম আবারও বলেন, “আমরা ভিক্ষা চাই না। শুধু চাই আমাদের ফসলটা একটু নিরাপদে রাখার জায়গা।”
এই একটি চাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বরগুনা ও পাথরঘাটার শত শত আলুচাষীর দীর্ঘশ্বাস, ঘাম আর না বলা কষ্টের গল্প।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত